সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় শুরু হওয়া চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের বাণিজ্য আলোচনার দিকে দৃষ্টি রাখছে বিশ্ববাজার। দীর্ঘমেয়াদি সমাধান না হলেও আলোচনার মাধ্যমে দুই অর্থনৈতিক পরাশক্তির মধ্যকার চলমান বাণিজ্যযুদ্ধে অন্তত একটি সাময়িক বিরতির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। খবর রয়টার্স।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এ প্রথম বড় পরিসরের আলোচনা শুরু হলো। বিশ্ববাজারে চাহিদা ও সরবরাহে অস্থিরতা, বিনিয়োগ অনিশ্চয়তা এবং উচ্চ শুল্কের প্রভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা প্রশমনে এ আলোচনাকে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
আলোচনা শুরুর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এরই মধ্যে চীনা পণ্যের ওপর ৮০ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়ে বলেছেন, ‘এটা সঠিক বলে মনে হচ্ছে।’
বর্তমানে চীনা পণ্যের ওপর ১৪৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক কার্যকর রয়েছে। যদিও ট্রাম্প এর আগেও শুল্ক কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন, এবারই প্রথম কোনো নির্দিষ্ট বিকল্প হার প্রকাশ্যে আনলেন। তবে এ প্রস্তাব আলোচনার টেবিলে আনবে কিনা, তা এখনো অনিশ্চিত।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট ও প্রধান বাণিজ্য আলোচক জেমিসন গ্রিয়ার। চীনের পক্ষে অংশ নিচ্ছেন দেশটির অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারক হি লিফেং। শুধু বাণিজ্য নয়, প্রযুক্তি, ফেন্টানিল পাচার ও ইউক্রেন যুদ্ধসহ নানা আন্তর্জাতিক ইস্যু আলোচনায় আসতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ বৈঠকে বাণিজ্যিক বিরোধে একটি সাময়িক বিরতি ঘোষণার সম্ভাবনা থাকলেও পূর্ণাঙ্গ শান্তি চুক্তির আশা করা অযৌক্তিক হবে। আলোচনার মাধ্যমে শুল্ক কিছুটা কমানো ও ভবিষ্যতের জন্য আলোচনার ভিত্তি স্থাপনই বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ফলাফল হতে পারে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের চীনবিষয়ক বিশ্লেষক স্কট কেনেডি বলেন, ‘চলতি সপ্তাহে কোনো চূড়ান্ত সমাধান আসবে না। বরং আলোচনার কাঠামো ও সম্ভাব্য এজেন্ডা নির্ধারণেই আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকবে।’
আলোচনার পরিধি এবার বেশ বিস্তৃত হওয়ায় মূল অর্থনৈতিক বিষয়ে অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলেও বিশ্লেষকদের আশঙ্কা। চীনের পক্ষ থেকে আলোচনায় একজন শীর্ষ জননিরাপত্তা কর্মকর্তার উপস্থিতি এ ইঙ্গিতই দেয় যে ফেন্টানিল ইস্যুসহ বাণিজ্য বর্হিভূত বিষয়ও আলোচনার বড় অংশজুড়ে থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে, চীন যেন অভ্যন্তরীণ বাজার উন্মুক্ত করে, আমেরিকান পণ্য বেশি আমদানি করে এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক মডেল থেকে সরে এসে বৈশ্বিক ভোক্তাবাজারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এ দাবি মানতে গেলে চীনকে শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে ব্যয়বহুল সংস্কার করতে হবে, যা তারা সহজে মেনে নিতে চায় না।
চীন বরং চাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র আরোপিত অতিরিক্ত শুল্ক প্রত্যাহার, চীনকে কী কী পণ্য বেশি কিনতে হবে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটিকে সমমর্যাদার অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হোক।
এ দ্বন্দ্বমূলক অবস্থান থেকেই স্পষ্ট বার্তা দেয় যে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি বৈঠকটিতে হওয়া সম্ভব নয়। সম্ভাব্য একটি মধ্যমপন্থা হতে পারে। তা হলো ১৪৫ শতাংশ শুল্ক হার কিছুটা কমিয়ে ৮০ বা ৬০ শতাংশে নামিয়ে আনা ও আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক সম্মতি প্রদান।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বিশ্লেষক রায়ান হ্যাস বলেন, ‘যেহেতু শুল্ক বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল একতরফাভাবে, শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্তও একইভাবে একতরফাভাবে নেয়া সম্ভব। চীন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৯০ দিনের শুল্ক অব্যাহতি চাইতে পারে। তবে বেশির ভাগ বিশ্লেষক মনে করেন তা দেয়া হবে না।’
ইএনজি ব্যাংকের চীনা অর্থনীতিবিদ লিন সং মনে করেন, শুল্ক যদি ৬০ শতাংশে নামানো যায়, তাহলে তা বর্তমানের তুলনায় অনেকটাই সহনীয় হবে। যদিও এ হার এখনো অনেক চীনা পণ্যের জন্য বাধা হবে, তবু এতে ভোক্তা ও আমদানিকারকদের ওপর চাপ কিছুটা কমবে।
যদিও এ আলোচনার ফলাফলকে উভয় পক্ষই নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে বিজয় হিসেবে তুলে ধরতে পারে, কিন্তু মূল কাঠামোগত সমস্যা থেকে যাবে। বিশ্বব্যবস্থায় একদিকে সস্তা চীনা উৎপাদন, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ ভোক্তা চাহিদা নির্ভরতা থেকেই বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। এ সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান আসছে না।
বৈঠকের আগে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার প্রস্তুতি আলোচনা ফেন্টানিল ইস্যু, প্রতিনিধিদের মর্যাদা ও যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যের ভাষা নিয়ে বিরোধে আটকে যায়। এ থেকেই বোঝা যায় পারস্পরিক বিশ্বাসের অভাব এখনো প্রবল।
তবু বাজারে কিছুটা স্বস্তি দেখা যাচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, অন্তত এ আলোচনা দুই পক্ষকে একে অন্যকে সরাসরি হুমকি দেয়া থেকে বিরত রাখবে। যদিও তাৎক্ষণিক কোনো চুক্তি না হলেও ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য ইতিবাচক ভিত্তি তৈরি হবে।